লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে কিছু মানুষের লিভারে প্রদাহ ও দাগ তৈরি হয়ে রোগটি গুরুতর হতে পারে। জীবনযাপনে পরিবর্তন এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসকের পরামর্শে রোগের অগ্রগতি কমানো সম্ভব।
ফ্যাটি লিভার কীভাবে হয়?
লিভার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করে, শক্তি সঞ্চয়ে সাহায্য করে এবং রক্ত থেকে বিভিন্ন বর্জ্য ও ক্ষতিকর পদার্থ সরাতে ভূমিকা রাখে। লিভারের কোষে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমলে সেই অবস্থাকে ফ্যাটি লিভার বা হেপাটিক স্টেটোসিস বলা হয়।
লিভারে চর্বি জমেছে মানেই লিভার নষ্ট হয়ে গেছে—এমন নয়। অনেকের ক্ষেত্রে শুধু চর্বি জমে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য প্রদাহ বা ক্ষত তৈরি হয় না। আবার কারও কারও লিভারে চর্বির পাশাপাশি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি হয়। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে লিভারে ফাইব্রোসিস বা দাগ তৈরি হতে পারে। দাগ বাড়তে বাড়তে সিরোসিসে রূপ নিতে পারে; উন্নত পর্যায়ে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া বা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে ফ্যাটি লিভার থাকা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এমন জটিলতা হয় না।
ফ্যাটি লিভারের ধরন
ফ্যাটি লিভারকে সাধারণভাবে এর পেছনের কারণ অনুযায়ী ভাগ করা হয়।
বিপাকজনিত ফ্যাটি লিভার
আগে এই অবস্থাকে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা NAFLD বলা হতো। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে MASLD—মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ—নামটি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড বা অন্যান্য বিপাকজনিত সমস্যার সঙ্গে এ ধরনের ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক থাকে।
রোগের মৃদু পর্যায়ে লিভারে চর্বি থাকলেও প্রদাহ বা উল্লেখযোগ্য কোষের ক্ষতি নাও থাকতে পারে। কিন্তু চর্বির সঙ্গে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি দেখা দিলে তাকে MASH বলা হয়। এটি আগে NASH নামে পরিচিত ছিল। MASH থেকে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ফাইব্রোসিস, সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতা হতে পারে।
অ্যালকোহল-সম্পর্কিত লিভার রোগ
নিয়মিত বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান লিভারে চর্বি জমা ও ক্ষতির কারণ হতে পারে। অ্যালকোহল-সম্পর্কিত লিভার রোগে প্রথমে চর্বি জমতে পারে; পরে প্রদাহ, লিভারের কোষের ক্ষতি এবং ফাইব্রোসিস তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন চললে সিরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। কারও বিপাকজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি অ্যালকোহল ব্যবহারের ইতিহাসও থাকতে পারে—তাই রোগের কারণ নির্ধারণে চিকিৎসককে অ্যালকোহল গ্রহণের বিষয়ে সঠিক তথ্য জানানো জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
ফ্যাটি লিভার যেকোনো বয়স ও শারীরিক গঠনের মানুষের হতে পারে। তবে নিচের বিষয়গুলো থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে:
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা—বিশেষত কোমর ও পেটের চারপাশে চর্বি বেশি থাকা
- টাইপ ২ ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
- রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকা বা কোলেস্টেরলের মাত্রা অস্বাভাবিক হওয়া
- উচ্চ রক্তচাপ
- শারীরিক পরিশ্রম কম করা
- বিপাকজনিত সিনড্রোম
- পরিবারে লিভারের রোগের ইতিহাস
- কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ, বংশগত সমস্যা বা অন্য লিভার রোগ
এসব ঝুঁকি থাকলেই যে ফ্যাটি লিভার হবে, তা নয়। আবার ওজন স্বাভাবিক বা ডায়াবেটিস নেই—এমন ব্যক্তিরও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বি এবং উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে লিভার ও সামগ্রিক বিপাকজনিত স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করা উপকারী।
লক্ষণ কী?
ফ্যাটি লিভারকে অনেক সময় “নীরব” রোগ বলা হয়, কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে বেশির ভাগ মানুষের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। কিছু মানুষের ক্লান্তি বা পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু এসব লক্ষণ অন্য কারণেও দেখা যায়। শুধু লক্ষণ দেখে ফ্যাটি লিভার নিশ্চিত করা যায় না।
স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপ ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ নয়; এগুলো ঝুঁকির কারণ। একইভাবে দুর্বলতা, বমিভাব বা পেট ফাঁপা থাকলেই ফ্যাটি লিভার হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
লিভারের রোগ অনেকটা অগ্রসর হলে চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, পেট বা পা ফুলে যাওয়া, তীব্র চুলকানি, গাঢ় প্রস্রাব কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এগুলোকে সাধারণ ফ্যাটি লিভারের স্বাভাবিক লক্ষণ ধরে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
রোগ নির্ণয়ে কোন পরীক্ষা করা হয়?
ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ে চিকিৎসক রোগীর ওজন, পূর্বের অসুস্থতা, ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা ও ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়।
রক্ত পরীক্ষা: ALT ও AST-এর মতো লিভার এনজাইম বেশি থাকলে লিভারে প্রদাহ বা ক্ষতির সন্দেহ হতে পারে। তবে শুধু রক্ত পরীক্ষার ফল দিয়ে ফ্যাটি লিভার বা লিভারের ক্ষতির পর্যায় নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসক অন্যান্য কারণও বিবেচনা করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে FIB-4 বা APRI-এর মতো স্কোর ব্যবহার করে উন্নত ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি যাচাই করতে পারেন।
আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি বা এমআরআই: এসব পরীক্ষায় লিভারে চর্বি জমার চিত্র দেখা যেতে পারে। তবে সাধারণ ইমেজিং পরীক্ষা দিয়ে লিভারে প্রদাহ আছে কি না বা ফাইব্রোসিস কতটা—তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
ফাইব্রোস্ক্যান বা ইলাস্টোগ্রাফি: বিশেষ ধরনের আল্ট্রাসাউন্ড পদ্ধতিতে লিভারের শক্তভাব মাপা হয়। শক্তভাব বেশি হলে ফাইব্রোসিসের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়। কিছু যন্ত্র লিভারের চর্বির পরিমাণ সম্পর্কেও ধারণা দেয়। ফলাফল চিকিৎসক রোগীর অন্যান্য পরীক্ষা ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেন।
লিভার বায়опসি: সবার জন্য প্রয়োজন হয় না। অন্য পরীক্ষায় গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে, রোগের পর্যায় স্পষ্ট না হলে বা অন্য লিভার রোগের সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বায়োপসি বিবেচনা করতে পারেন। এতে লিভার থেকে ছোট টিস্যু নিয়ে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়।
চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা নির্ভর করে এর কারণ, লিভারে প্রদাহ বা দাগ আছে কি না এবং রোগীর অন্য স্বাস্থ্যসমস্যার ওপর। সবার জন্য একই ওষুধ বা চিকিৎসা নেই। বিপাকজনিত ফ্যাটি লিভারে ওজন বেশি থাকলে ধীরে ও নিরাপদভাবে ওজন কমানো লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে। শরীরের ওজনের ৩–৫ শতাংশ কমলেও লিভারের চর্বি কমতে পারে; প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসে প্রভাব ফেলতে কারও ক্ষেত্রে ৭–১০ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমানো প্রয়োজন হতে পারে। দ্রুত ওজন কমানো বা অপুষ্টি তৈরি করে এমন খাদ্যাভ্যাস ক্ষতিকর হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়, কোমল পানীয়, মিষ্টি চা, অতিরিক্ত চিনি এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো যেতে পারে। শাকসবজি, ডাল, ফল, পূর্ণশস্য এবং পরিমিত প্রোটিনসহ সুষম খাবার বেছে নেওয়া ভালো। স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের বদলে স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপও গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যালকোহল লিভারের ক্ষতি বাড়াতে পারে। অ্যালকোহল-সম্পর্কিত লিভার রোগে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশ নেওয়া জরুরি; বিপাকজনিত ফ্যাটি লিভার থাকলেও অ্যালকোহল গ্রহণ নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ করা, নতুন ওষুধ শুরু করা বা হারবাল ও “লিভার ডিটক্স” সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। কিছু সাপ্লিমেন্ট ও ভেষজ উপাদান লিভারের ক্ষতি করতে পারে। বর্তমানে নির্দিষ্ট পর্যায়ের MASH ও ফাইব্রোসিসে কিছু রোগীর জন্য বিশেষ ওষুধ বিবেচিত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালের হালনাগাদ নির্দেশনায় AASLD মাঝারি থেকে অগ্রসর ফাইব্রোসিস—F2–F3—থাকা নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে সেমাগ্লুটাইড চিকিৎসা বিবেচনার কথা বলেছে। এটি সবার জন্য নয়; রোগীর উপযুক্ততা ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করবেন।
প্রতিরোধে কী করা যায়?
ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ বা ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, সুষম খাবার খাওয়া এবং ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহায়ক। অ্যালকোহল গ্রহণ করলে তা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। হেপাটাইটিসের টিকা কিছু ভাইরাসজনিত লিভার সংক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে, তবে টিকা ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা নয়।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে পরীক্ষার ফল ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি চিকিৎসকের সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার। আল্ট্রাসাউন্ডে চর্বি দেখা গেলেই সিরোসিস হয়েছে—এমন নয়; আবার কোনো লক্ষণ না থাকলেও লিভারের অবস্থা যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। রোগের পর্যায়, কারণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে চিকিৎসকের মূল্যায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য; ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।
তথ্যসূত্র: NIDDK—রোগের ধরন ও কারণ, NIDDK—রোগ নির্ণয়, NIDDK—চিকিৎসা, AASLD—MASH চিকিৎসা নির্দেশিকা হালনাগাদ