চলতি বছরে জেলায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড, এর মধ্যে ৯টি গুলি করে। রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় অস্ত্রধারীদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ; বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে জেলা পুলিশ।
খুলনা জেলায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় অস্ত্রধারীদের তৎপরতা এবং অপরাধীদের দাপটে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৯টি গুলি করে সংঘটিত টার্গেট কিলিং।
সর্বশেষ ৪ ও ৫ অক্টোবর দিঘলিয়া ও রূপসায় পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৫ অক্টোবর রূপসায় গুলিতে নিহত হন আক্তার ঢালী। এর এক দিন আগে দিঘলিয়ায় প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় চরমপন্থি নেতা নাসিমুল গনি ওরফে নাসিমকে। পরপর এসব ঘটনায় জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নিরাপত্তা চেয়েও বাঁচেননি আক্তার ঢালী
গত ১৫ আগস্ট রূপসায় আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালী হত্যার শিকার হন। ওই ঘটনায় মামলা করেছিলেন তাঁর বাবা আক্তার। এরপর নিরাপত্তা চেয়ে ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। কিন্তু ৫ অক্টোবর তাঁকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।
মামলার কারণে আক্তারকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করার পরও তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকার মানুষের মধ্যে ভয় আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের অনেকে হত্যাকাণ্ড বা অপরাধ নিয়ে কথা বলতে, অভিযোগ জানাতে কিংবা মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না।
এর আগে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া উপজেলায় নিজ বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন নাসিমুল গনি নাসিম। সেখানেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে ঘটায় ওই এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চার উপজেলায় অপরাধ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বটিয়াঘাটা, রূপসা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলায় উঠতি বয়সী যুবকদের দলবদ্ধ চলাচল ও মহড়া বেড়েছে। বিভিন্ন খাল-বিল এলাকায় তারা ঘাঁটি গেড়ে থাকে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় অপরাধের পর সেখানে আশ্রয় নেওয়া সহজ, আর পুলিশও অনেক সময় দ্রুত তাদের খুঁজে পায় না—এমন ধারণা স্থানীয়দের।
একসঙ্গে দুই-তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে লোকজনের চলাচলও অনেকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। কে কী উদ্দেশ্যে এলাকায় ঘুরছে, তা বোঝা কঠিন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, বটিয়াঘাটা এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বেড়েছে। চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে, কিন্তু ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে চান না।
রূপসার ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের সুবিধার কারণে বিভিন্ন এলাকার অপরাধীরা সেখানে আশ্রয় নেয়—এমন কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
জেলায় ৩৫ হত্যাকাণ্ড, তদন্তাধীন ১০টি
জেলা পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরে খুলনা জেলায় মোট ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে; বাকি ১০টি এখনো তদন্তাধীন। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রূপসা উপজেলাতেই ১২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণের হিসাবে দেখা যায়, ৯টি ছিল গুলি করে সংঘটিত টার্গেট কিলিং। মাদককে কেন্দ্র করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে তিনটি। সামাজিক দ্বন্দ্ব ও মারামারির জেরে ঘটেছে ১৩টি হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে দুটি, অজ্ঞাত কারণে দুটি এবং পারিবারিক বা পরকীয়াজনিত কারণে চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া শ্বাসরোধে দুই নবজাতককে হত্যার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ
জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটাকে জেলার সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ থানা এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীদের খুঁজে বের করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলা পুলিশের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা মাঠে থেকে অভিযান চালাচ্ছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, জেলায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রূপসায় জয় ঢালী ও তাঁর বাবা আক্তার ঢালী এবং দিঘলিয়ায় নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম হত্যার তদন্ত চলছে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে; বিশেষভাবে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
আক্তার ঢালী নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করার পরও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাটিকে সংবেদনশীল উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, বিষয়টি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।